চ্যানেল ওম টিভি

৩শ বছরের পুরনো পীঠস্থান কাঞ্চননাথ শিবালয় !

৩শ বছরের পুরনো পীঠস্থান কাঞ্চননাথ শিবালয় কাঞ্চন নাথ মন্দির চট্টগ্রাম শহর থেকে অক্সিজেন হয়ে ফটিকছড়ির বিবিরহাট অতিক্রম করে মধ্য কাঞ্চননগরের কাঞ্চন হাটখোলা নামক স্থানে খরস্রোতা ধুরং খালের পাশ ধার পাঁচ মিনিট হাঁটলেই দেখা মিলে ঐতিহাসিক বাবা কাঞ্চননাথ মন্দিরের। প্রায় ৩০০ বছরেরও অধিক পুরনো শিব মন্দির এটি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আনুমানিক ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মাটি থেকে স্বয়ং উদ্ভব হয় এই শিব লিঙ্গটি। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ, মহেশখালীর আদিনাথ ও কাঞ্চন নগরের কাঞ্চননাথ একই সময়ে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে বাবা কাঞ্চননাথের নামে ইউনিয়নটির নামকরণ করা হয়। চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থে এ মন্দিরটির কথা উল্লেখ আছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কাঞ্চননগর ইউনিয়ন। মন্দিরের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে কথা হয়েছিল সত্তর বছর বয়স্ক নুরুল আলম, নুরুল হক ও মন্দিরের বর্তমান পুরোহিত বাবুল ভট্টাচার্যের সাথে। তারা জানিয়েছেন, গ্রামটিতে লালা তিলকচান বাবু নামে এক জমিদার ছিলেন। তাঁর অনেকগুলো গাভী ছিলো। হরিজন সম্প্রদায়ের একজন রাখাল গাভীগুলো দেখাশোনা করতেন। প্রতিদিন দুপুরে একটি গাভী কোথাও চলে যেতো, খুঁজে পাওয়া যেতো না। কিন্তু বিকেল হতে হতে গাভীটি গোয়ালে ফিরে আসতো। এ ব্যাপার প্রতিদিন ঘটতো। উপায়ন্তর না দেখে রাখাল বিষয়টি জমিদার বাবুকে জানান। তখন লালা তিলকচান বললেন- গরুটির উপর লক্ষ্য রাখতে। রাখাল পরের দিন গাভীটির উপর লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখেন, বর্তমানে যে জায়গায় বাবা কাঞ্চননাথ শিবলিঙ্গ অবস্থিত সে জায়গায় দুধ প্রদান করছে। তখন রাখাল বিষয়টি জমিদার লালা তিলকচান বাবুকে জানানোর পর পরের দিন তিনি স্বচক্ষে দেখতে পান যে, গাভীটি নিত্যদিনের মতো দুধ প্রদান করছে একই জায়গায়। তিনি জায়গাটির পাশে যাওয়ার সাথে সাথে গাভীটি অদৃশ্য হয়ে যায়। লালা তিলকচান বাবু বন-জংগল পরিবেষ্টিত জায়গাটি পরিষ্কার করে দেখতে পান পাথরের কিছু অংশ। তার কিছু বোধগম্য হয়ে উঠেনি তখন। তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তুতিনি রাতে ঘুমাতে পারছিলেন না। অজানা কারণে তিনি হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়লে মহাদেব স্বপ্নাদেশ করে বলেন, সকলের মঙ্গলের জন্য আমি ঐখানে অধিষ্ঠিত হয়েছি। এতে ঘুম ভেঙ্গে যায় তিলকচান বাবুর। তিনি পাথর খণ্ড প্রাথমিক অবস্থায় পুরোপুরি তুলে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে কুঠারের আঘাতে ভেঙ্গে যায় শিব লিঙ্গটি এবং তিনি যতই মাটি খনন করছিলেন ততই দেখতে পাচ্ছিলেন অনন্ত, সীমানাহীন শিব লিঙ্গটি। তিনি ভঙ্গুর হৃদয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে কান্নাকাটি করছিলেন। সে রাতে আবারো স্বপ্নাদেশ পান যে কুঠারের আঘাতে তিনি কষ্ট পাননি, তিনি ওইভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চান এবং তিলক বাবুকে বলেন, ঐখানে মন্দির স্থাপনের জন্য। সেভাবেই কাজ শেষ করেন জমিদার বাবু। পরবর্তীতে তিলকচান বাবুর দেহত্যাগের পর তার ছেলে মানিক ও কাঞ্চন ঐ এলাকার জমিদার হন। তৎসময় থেকে কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন ও মানিকপুর ইউনিয়ন নামে পরিচিত। কালক্রমে ঐ এলাকা নানা কারণে হিন্দু জনশূন্য হতে থাকে ১৯৭১ পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জনৈক সাধক ভারত থেকে এসে এ মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেন। আবারো এ মন্দিরটিতে পূজা শুরু হয়। মন্দিরের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তাপস নাথ ও অর্থ সম্পাদক ডা. দিলীপ কান্তি দে জানান, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের বাবর মসজিদ বিবাদের সময় বাংলাদেশে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী মন্দিরটি ভাংচুর করতে এলে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু এক অদ্ভুত অলৌকিক কারণে তারা ভয় পেয়ে পালিয়ে যান এবং যারা এ কাজের সাথে জড়িত ছিলেন তাদের অনেকেই সে বছর বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা যান এবং অনেকের পরিবারের বংশসহ নিঃশেষ হয়ে গেছে। বাবা কাঞ্চন নাথ বিভিন্ন সময়ে দেখা দেন বিভিন্নজনের কাছে। সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয়, এ মন্দিরের ২ কিলোমিটারের মধ্যে কোন হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতি নাই কিন্তু ৫০ বছর ধরে আজ অবধি মো. ইউসুফ নামে একজন মুসলমান এ মন্দিরটির দেখাশোনা করেন। তিনি বলেন, বছরে শ্রাবণ মাস ও হঠাৎ করে দেখা মিলে বিরাট আকারের একটি সাপের। সাপটি এসে শিব লিঙ্গটিকে পেঁচিয়ে থাকেন। কারো কোনদিন ক্ষতি করেনি, বরং দেখা দিয়ে হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। তিনি বলেন, একবার এ মন্দিরটি পরিষ্কার করতে গিয়ে দুই একটা গাছ কেটে ফেলেন। সেদিন রাতেই তাকে এক বানর স্বপ্নে দেখা দিয়ে গাছ কাটতে নিষেধ করেন। এরপর তিনি আর কোন গাছ কাটেননি। আরেকবার এক ব্যক্তি মন্দিরের বেল গাছের শাখা কাটতে গেলে গাছে অলৌকিকভাবে একটি সাপ ফণা ধরে চলে আসে, সে কাঠুরিয়ার সমস্ত দেহ নিথর হয়ে যায় পরে সবাই তাকে গাছ থেকে নামিয়ে আনে। অশৌচ অবস্থায় এক রং মিস্ত্রি মন্দিরের রং করার জন্য মূল মন্দিরের উপর উঠলে অজ্ঞান হয়ে যায়। বাবা কাঞ্চননাথ মন্দিরের আরেকটি ঘটনা সবাইকে অবাক করে দেয়, প্রতিবছর শিব চতুর্দশীতে ভক্তবৃন্দ প্রায় ১০০০ লিটার ডাবের জল ও দুধ দিয়ে বাবাকে স্নান করান, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় মন্দিরের শিব স্নানের জল মন্দিরের বহির্গমন লাইন দিয়ে বের হয়ে অজানা কারণে অদৃশ্য হয়ে যায়। বাহিরের এক হাত মাটিও ভিজে না। বর্তমান সহ-সভাপতি সাধন চন্দ্র দাশ বলেন, ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৫/০৬ সাল অর্থাৎ ১৭/১৮ বছর সকল ধরনের পূজা-অর্চনা না হওয়াতে বাবা কাঞ্চননাথ মন্দিরের পরিচিতি হ্রাস পায়। কিন্তু স্বয়ম্ভূ বাবা শিব তথা কাঞ্চননাথ আবার স্ব-মহিমায় আত্মপ্রকাশ করে নিজের মহিমা ফুটিয়ে তোলেন। বর্তমান সময়ে নিত্য পূজাসহ উত্তরায়ণ তিথি পৌষ সংক্রান্তিতে গীতাপাঠ ও শিব চতুর্দশীতে বাৎসরিক মহোৎসব ও বিশাল মেলা অনুষ্ঠিত হয় মহাসমারোহে। পাশাপাশি প্রায় ৩৫০০ জন ভক্তের প্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়। তবে ২০০৬ সাল থেকে এ মন্দিরের উন্নয়নকল্পে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। মন্দির পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান সভাপতি নির্মল কান্তি দেব বলেন, নতুন কমিটির তত্ত্বাবধানে মন্দির পুনসংস্কার, হারিয়ে যাওয়া সীমানা প্রায় ৫ কানি ১৫ গন্ডা জমি উদ্ধার, কিছু অংশ সীমানা নির্মাণ, অফিস ঘরসহ নলকূপ বসানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, একার পক্ষে সব কাজ করা দুরূহ ও কষ্টসাধ্য। তাই ডা. ফিরোজ সাহেবের ছেলে আযম সাহেব মন্দিরের পুকুর সংস্কার ও জলাধারের জন্য পুকুর ঘাট নির্মাণ করেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.