চ্যানেল ওম টিভি

অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জন্মদিন আজ

আজ ৫ মে , ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের প্রথম নারী আত্মদানকারী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের (৫ মে ১৯১১ – ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২) ১০৯ তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১১ সালে ৫মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই বীর কন্যা। শুভ জন্মদিন বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

কলকাতা থেকে বি.এ পাশ করে চট্রগামে চলে আসেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনকে চোখে দেখার ব্রত তিনি আগেই নিয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল তাঁর নির্দেশে দেশ মাতৃকার জন্য একটা কিছু করার। একটি সফল অপারেশন সম্পন্ন করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি ঘটনাস্থলেই পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পটাসিয়াম সায়ানাইড খান। সঙ্গি কালী কিংকর দে’র কাছে তিনি তাঁর রিভলবারটা দিয়ে আরো পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে কালী কিংকর তা প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন। উদ্দেশ্য ছিল, বিশ্ববাসীকে জানানো যে, ভারতীয় উপমহাদেশের নারীরাও আজ দেশের জন্য লড়াই করছে। মৃত্যুর পর তার সাথে পাওয়া যায় একটি ছোট্ট চিরকুট। যাতে লিখা ছিল,

“আমরা দেশের মুক্তির জন্য এই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি। অদ্যকার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি অংশ। ব্রিটিশরা জোর পূর্বক আমাদের স্বাধীনতা ছিনাইয়া লইয়াছে। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সমস্ত বিপদ ও বাঁধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন- এই আশা লইয়া আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।”

আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এই বিপ্লবী বীরকে।

এক নজরে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদর : প্রীতিলতার নাম নতুন করে বলার কিছু না থাকলেও খুব অল্পজনই জানে তার সম্পর্কে। অন্তর্মুখী, লাজুক এবং মুখচোরা স্বভাবের এই বীরকন্যার জন্ম ১৯১১ সালে ৫মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভা অফিসের প্রধান কেরানী। মাতা প্রতিভা ওয়াদ্দেদার ছিলেন গৃহিণী। আদর করে প্রীতিলতার মা প্রীতিলতাকে “রাণী” ডাকতেন। আর “ফুলতার” ছিল তার ছদ্মনাম। চট্টগ্রামের ডাঃ খাস্তগির বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী ছিলেন প্রীতিলতা। ১৯১৮ সালে উক্ত বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন তিনি।

খুবই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। প্রতিটি শ্রেণীতে তিনি ১ম কিংবা ২য় ছিলেন। ১৯২৬ সালে অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন বৃত্তি পেয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস সহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। পরবর্তীতে ঢাকার ইডেন কলেজ হতে ১৯৩০ সালে আইএ পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান অধিকার করা এই বীরকন্যা কলকাতার বেথুন কলেজ হতে ১৯৩২ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করে চট্রগামে চলে আসেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনকে চোখে দেখার ব্রত তিনি আগেই নিয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল তাঁর নির্দেশে দেশ মাতৃকার জন্য একটা কিছু করার। এসে যোগ দেন চট্টগ্রামের অর্পণাচরণ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে।

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামে পাহাড়তলীস্থ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত হলে সূর্যসেন এই অভিযানের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে। তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র। পাহাড়ঘেরা এই ক্লাবের চতুর্দিকে ছিল প্রহরী বেষ্টিত। একমাত্র শ্বেতাঙ্গরা এবং ক্লাবের কর্মচারী, বয়-বেয়ারা, দারোয়ান ছাড়া এদেশীয় কেউ ঐ ক্লাবের ধারে কাছে যেতে পারতো না। সন্ধ্যা হতেই ইংরেজরা এই ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ, গান এবং আনন্দ উল্লাস করতো। এই ক্লাবের ফটকে লেখা ছিল “কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ”! ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের আগে চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ কাট্টলীতে যোগেশ মজুমদার নামের ঐ ক্লাবেরই একজন বেয়ারার বাড়িতে বিপ্লবীরা আশ্রয় পেলেন। যোগেশ মজুমদার ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের ব্যাপারে বিপ্লবীদের সহায়তা করেন।

২৪ সেপ্টেম্বর এ আক্রমণে প্রীতিলতার পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকা দেবার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি, পায়ে রবার সোলের জুতা। ইউরোপিয়ান ক্লাবের পাশেই ছিল পাঞ্জাবীদের কোয়ার্টার। এর পাশ দিয়ে যেতে হবে বিধায় প্রীতিলতাকে পাঞ্জাবী ছেলেদের মত পোশাক পড়ানো হয়েছিল। সে দিনের আক্রমণে প্রীতিলতার সাথে যারা ছিলেন তারা হলেন- কালী কিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী (এদের পরনে ছিল- ধুতি আর শার্ট), মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন (এদের পরনে ছিল- লুঙ্গি আর শার্ট)! বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার প্রথমে ক্লাবের ভিতর থেকে রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে আক্রমণের নিশানা দেখিয়ে দেন এবং এর পরেই ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়।

সেদিন ছিল শনিবার, প্রায় ৪০জন মানুষ তখন ক্লাবঘরে অবস্থান করছিল। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন। পূর্বদিকের গেট দিয়ে ওয়েবলি রিভলবার এবং বোমা নিয়ে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিলতা, শান্তি চক্রবর্তী এবং কালী কিংকর দে। ওয়েবলি রিভলবার নিয়ে সুশীল দে এবং মহেন্দ্র চৌধুরী ক্লাবের দক্ষিণের দরজা দিয়ে এবং পিস্তল নিয়ে বীরেশ্বর রায়, রাইফেল আর হাতবোমা নিয়ে পান্না সেন আর প্রফুল্ল দাস ক্লাবের উত্তরের জানালা দিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিলেন।

প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ইউরোপিয়ান ক্লাব কেঁপে উঠেছিল। ক্লাবঘরের সব বাতি নিভে যাওয়ার কারণে ক্লাবে উপস্থিত থাকা সবাই অন্ধকারে ছুটোছুটি করতে লাগল। ক্লাবে কয়েকজন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার থাকায় তারা পাল্টা আক্রমণ করল। একজন আর্মি অফিসারের রিভলবারের গুলিতে প্রীতিলতার দেহের বাম পাশে গুলির আঘাত লাগে। প্রীতিলতার নির্দেশে আক্রমণ শেষ হলে বিপ্লবী দলটির সাথে তিনি কিছুদূর এগিয়ে আসেন। সেই দিনের আক্রমণে মূলত অনেক ব্রিটিশ নিহত হলেও পুলিশের রিপোর্টে মাত্র ১জন নিহত ও ১১জন আহতের খবর প্রকাশ করা হয়।

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ শেষে পুলিশ এর হাতে ধরা দেয়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয় জ্ঞান করে পূর্বসিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে দেন। কালী কিংকর দে’র কাছে তিনি তাঁর রিভলবারটা দিয়ে আরো পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে, কালী কিংকর তা প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন।

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে অংশ নেয়া অন্য বিপ্লবীদের দ্রুত স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দেন প্রীতিলতা। পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া প্রীতিলতাকে বিপ্লবী শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই স্থান ত্যাগ করে। পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে মৃতদেহ দেখে পরবর্তীতে প্রীতিলতাকে সনাক্ত করেন। তাঁর মৃতদেহ তল্লাশীর পর পাওয়া যায় সেই ছোট্ট চিরকুট, যার কথা আগেই বলা হয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.